Deshsangbad24
একাকী ১১৫ বছরের আব্দুল বারীর পাশে উপজেলা প্রশাসন

 

বয়সের ভারে নুয়ে পড়ার কথা। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও জীবিকার তাগিদে সাইকেলের প্যাডেল ঘুরিয়ে চলেছেন আব্দুল বারী। সারাদিন গ্রাম গ্রাম ঘুরে কড়াই-সাড়ার কাজ, কখনো ছোটখাটো শ্রম—দিনভর পরিশ্রম করে যা আয় হয়, তা দিয়ে চাল-ডাল কিনে নিজেই রান্না করে খান তিনি। নিজের বলতে নেই কোনো জমি, নেই নিরাপদ একটি ঘরও। পরের জমিতে ঝুপড়ি ঘর তুলে একাই বসবাস করছেন এই প্রবীণ।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার মোমিনপুর ইউনিয়নের কবিখালী মসজিদপাড়া এলাকার সড়কের পাশে একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করেন আব্দুল বারী। তিনি নিজের বয়স ১১৫ বছর বলে দাবি করলেও জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার জন্ম ১৯২১ সালে। সে হিসেবে বর্তমানে তার বয়স ১০৫ বছর।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে আব্দুল বারীর অসহায় জীবনযাপনের ছবি ও ভিডিও। সেখানে তাকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সহায়তার কথা বলা হলেও বাস্তবে কোনো অর্থ বা সহায়তা তার কাছে পৌঁছায়নি বলে দাবি করেছেন তিনি।

জানা গেছে, প্রায় সাত বছর আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকেই একাকী জীবন কাটাচ্ছেন আব্দুল বারী। তার দুই কন্যা থাকলেও তারা খোঁজখবর নেন না বলে জানিয়েছেন তিনি। ফলে জীবনের শেষ বয়সেও নিজের খাবারের সংস্থান নিজেকেই করতে হচ্ছে তাকে।

রোববার সকালে আব্দুল বারীর অসহায় জীবনযাপনের খবর সংগ্রহ ও তার খোঁজ নিতে তার বাড়িতে যান চ্যানেল ওয়ানের জেলা প্রতিনিধি শেখ সাদিক, নাগরিক টিভির জেলা প্রতিনিধি শামসুজ্জোহা পলাশ, এনটিভি অনলাইন ও দৈনিক মাথাভাঙ্গার রিপোর্টার মো. আব্দুল্লাহ হক এবং দৈনিক আমাদের সংবাদের রিপোর্টার বালাদুল আমীন।

সাংবাদিকরা তার দুরবস্থার বিষয়টি চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তিথি মিত্রকে অবহিত করেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আব্দুল বারীর পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেন ইউএনও।

পরে ৬ সেপ্টেম্বর দুপুর দেড়টার দিকে উপজেলা প্রশাসনের ত্রাণ তহবিল থেকে শুকনা খাবার নিয়ে আব্দুল বারীর বাড়িতে ছুটে যান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্র। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নাহিদা ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা আব্দুল বারীর সঙ্গে কথা বলেন এবং তার জীবনযাপন ও বসবাসের স্থান সরেজমিনে পরিদর্শন করে সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন। এ সময় আব্দুল বারীর জন্য স্থায়ীভাবে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন ইউএনও।

তাৎক্ষণিক সহায়তা হিসেবে আব্দুল বারীর হাতে তুলে দেওয়া হয় ১০ কেজি চাল, ১ কেজি ডালসহ শুকনা খাবারের মোট আটটি আইটেম। খাবার পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই প্রবীণ। গত কয়েকদিন ধরে অসুস্থ থাকায় ঠিকমতো খাবারও খেতে পারছেন না বলে জানান তিনি।

প্রশাসনের এই সহায়তা পেয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্রসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান আব্দুল বারী।

আব্দুল বারী বলেন, “বিভিন্ন লোকজন আমাকে সহযোগিতা করার কথা বলেছেন। কিন্তু আমার কাছে কোনো কিছু আসেনি। এলাকার মানুষ বিভিন্ন সময় সহযোগিতা করেন। আমি বয়স্ক ভাতাও পাই। আজ উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসেছিলেন, আমি খুব খুশি হয়েছি।”

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্র বলেন, “আব্দুল বারী দাবি করেন তার বয়স ১১৫ বছর। তবে আমরা তার এনআইডি কার্ডে দেখেছি, তার জন্ম ১৯২১ সালে। সে হিসেবে তার বয়স ১০৫ বছর। তিনি এখনো যথেষ্ট সক্ষম ও সচল আছেন।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা আজকে তার ঘরটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। আমার সঙ্গে সদর উপজেলার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাও ছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, তার নিজস্ব কোনো জমি নেই। তবে তিনি যে জমিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন, সেই জমির মালিক যদি লিখিতভাবে আবেদন করেন বা একটি চুক্তিপত্র দেন যে, সরকারি সহায়তায় ওই জমিতে ঘর করে দিলে আব্দুল বারী আজীবন সেখানে থাকতে পারবেন, তাহলে ভবিষ্যতে যে প্রকল্প আসবে সেখান থেকে সরকারি বরাদ্দের মাধ্যমে তার থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।”

ইউএনও বলেন, “আপাতত উপজেলা প্রশাসনের ত্রাণ তহবিল থেকে ১০ কেজি চাল, ১ কেজি ডালসহ শুকনা খাবারের আটটি আইটেম তাকে দেওয়া হয়েছে। তিনি সরকারি বয়স্ক ভাতাও পান। তবে এই সহায়তা একজন মানুষের জন্য যথেষ্ট নয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা চেষ্টা করব, তাকে যতটুকু সম্ভব সহায়তা করা যায়। আমরা সবসময় তার পাশে থাকার চেষ্টা করব।”

জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও নিজের জীবিকার দায়িত্ব নিজেকেই বহন করে চলা আব্দুল বারীর জীবনকাহিনি সমাজের প্রান্তিক ও অসহায় প্রবীণদের বাস্তবতার একটি চিত্র তুলে ধরে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার জীবনযাপনের চিত্র ছড়িয়ে পড়ার পর সাংবাদিকদের উদ্যোগে উপজেলা প্রশাসনের তাৎক্ষণিক সহায়তা মিললেও, স্থানীয়দের মতে, তার মতো অসহায় প্রবীণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সহায়তার ব্যবস্থাই এখন সবচেয়ে জরুরি।