1. admin@deshsangbad24.com : Ridoy Rayhan : Ridoy Rayhan
লেখক-কমল খোন্দকার - দেশ সংবাদ ২৪
বিজ্ঞপ্তি :
দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কলেজে একযোগে সাংবাদিক নিয়োগ চলছে। ০১৭১৩-৯২৩৫১০-০১৭১৩-১৩৯৬৭১
সংবাদ শিরোনাম :
মাত্র দেড় মাস বয়সের শিশুটি করোনায় আক্রান্ত হয়ে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি। ভেড়ামারা তে ২য় দিনের লকডাউন চলছে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের স্বেচ্ছাসেবক টিমের করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবার মুহূর্তগুলো আলহজ্ব রিকুল আলম চুনুকে ফুলেল শুভেচ্ছা সিক্ত মারা করলেন সাতবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি চপল ভেড়ামারা রেল বাজার বণিক সমিতির উদ্যোগে শহরে মাস্ক বিতরণ বাঁচতে চান রিক্তা মাত্র ৩ ঘন্টায় অজ্ঞাত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করে লাশ হস্তান্তর করেছে ভেড়ামারা থানা পুলিশ কুষ্টিয়া জেলাব্যাপী কঠোর লকডাউনের ঘোষণা আসছে রাত ১২ টা থেকে মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে জমি ও গৃহ প্রদান কার্যক্রম ২য় পর্যায়ের ভার্চুয়াল শুভ উদ্বোধন করোনা আক্রান্তের হয়ে বাড়িতে লাল পতাকা লজ্জায় ঘৃণায় রোগী আত্মহত্যা

লেখক–কমল খোন্দকার

  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১ জুন, ২০২১
  • ৪২ জ্ন দেখেছেন

লেহাজ -(২)

ম্যারাথন দৌড়ে গিনেস বুকের সব কয়টা রেকর্ড ভঙ্গ করে পাঁচ মিনিটে বাড়ি পৌঁছানোর লাল ফিতার বর্ডার লাইন ছুঁয়ে সোনার কাপটা হাতের নাগালে পেয়েও মাত্র দুই মিনিটের মার্কসের অভাবে কাপটা হাত থেকে ছিটকে মাটিতে আছাড় খেয়ে খানখান হয়ে ভেঙে পড়ে গ্যালো লেহাজের কমজোরি পায়ের কারণে। ঘামের জলে স্নান সারতে সারতে ভেজা শরীর নিয়েই নিজের ঘরের চেয়ারটার ওপর গদিনসীন হালে বসে পড়লো লেহাজ ঝড়ে ভেঙে পড়া তাল গাছের মতো। বুকের মধ্যে হার্টের ওপর কামার বাড়ির হাপরের হাঁপানির শোঁ শোঁ গর্জন ধ্বনি নিয়ন্ত্রণে আনার প্রাণপণ চেষ্টা বিফলে যাচ্ছিলো বারবার।

এত কিছুর পরেও বুড়ির বিচার বিবেচনা শক্তির প্রশংসা না করে থাকতে পারলো না লেহাজ। প্রায় আধা ঘণ্টা পরে ওর গনগনে আগুন লাল হার্টের ওপর কামারের বাহাত্তর কেজি ওজনের হাতুড়ির বাড়ির উত্তাল ঝড় শান্ত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পাওয়ারও প্রায় দশ মিনিট পার করে ঝকঝকে স্ফটিক স্বচ্ছ কাঁচের গ্লাসে নজর কাড়া বরফের টুকরো ভাসা পাকা করমচা কালারের এক গ্লাস রুহ আফজার শরবত,বুড়ির ঠোঁটের রংয়ের কাছাকাছি প্রীজম আকৃতিতে কাটা এক থালা তরমুজ আর বাড়ির পেয়ারা গাছের বাছাই করা না কাঁচা না পাকার মধ্যবর্তি অবস্থানের চমকপ্রদ স্টাইলে টুকরো করা লেহাজের প্রিয় স্বাদের কয়েক ফালি ডেকোরেটেড পেয়ারার ওপর বিট লবন ছড়ানো সুসজ্জিত ট্রে হাতে ধীরে সুস্থে সুচিত্রা সেনের স্টাইলে সুচিত্রা সেনের মতোই চিরসবুজ আর সব যুগের আধুনিকতাকে বুড়ো আঙুল দেখানো চির যৌবনা বুড়ি মোহনীয় ভঙ্গিমায় বসলো এসে লেহাজের খাটের ওপর। বুড়ির সুচিত্রা প্রভাবে প্রভাবান্বিত হওয়ার কারনেই কিনা কে জানে,নিজেকে কেমন যেনো উত্তম কুমার উত্তম কুমার লাগছিলো লেহাজের। লীলায়িত আঙুলে ট্রে’র প্রতি লেহাজের দৃষ্টি আকৃষ্ট করতে অপূর্ব দোলায় বুড়ির আঙুলের ডগা বেয়ে আচ্ছন্ন অনুভবের মোড়কের ভেতরে তরতর করে সাঁতরিয়ে যেনো ঢুকে পড়লো লেহাজের চোখের দৃষ্টি। বুড়ির রংবাহারি রূপের দিকে ঘোর লাগা দৃষ্টি স্থির নিবদ্ধ রেখেই ওর স্বয়ংক্রিয় হাত সৎকার করে দিলো ট্রেতে সাজানো সবগুলো উপাদেয় সুস্বাদু উপাদান। গালের এক পাশে সুকৌশলে মুখের পান লুকিয়ে কমলার কোয়ার মতো অধরোষ্ঠ এবার ঈষৎ স্ফুরিত করলো বুড়ি।
‘যা, তোর জন্য আলাদা করে ঠান্ডা পানি রাখা আছে ওয়াশরুমে, গোসল সেরে আয়। এখানেই অপেক্ষা করছি আমি। ‘

বুড়িকে চুমু খাওয়ার অদম্য ইচ্ছাটা অতি কষ্টে নিবারণ করে কৃতজ্ঞ চিত্তে বুড়ির দিকে প্রেমপূর্ণ সোহাগ ঢালতে ঢালতে অ্যাটাচড্ বাথরুমে গিয়ে ঢুকলো লেহাজ।

পুরোপুরি ফ্রেস হয়ে বুড়ির কোলের ওপর গড়িয়ে পড়ে ‘তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমার’ গাইতে গাইতে বুড়ির গলা জড়িয়ে আল্লাদ পর্বটা সেরে নিলো লেহাজ সবসময়ের মতো। সস্নেহে ওর কপালে চুমু খেয়ে লেহাজের আধ ভেজা চুলে কোমল আঙুল বোলাতে বোলাতে হেমন্তের শিশির হয়ে ওর মুখের ওপর ঝরে পড়লো বুড়ির আদরসিক্ত কন্ঠ।
‘ খুব রেগে ছিলি আমার ওপর? ‘

উদাসী গলায় বুড়ির টনটনা গালে একটা মোলায়েম ঠোনা মেরে উত্তর দিলো লেহাজ।
‘ ছিলাম,তবে তোর এত খাতির তোয়াজে ভুলে মেরে দিয়েছি সব। এখন শুধুই পিয়ারের খেলা।

আল্লাদের সময় বুড়ির সাথে বরাবরই তুই তোকারির সম্পর্ক চালিয়ে থাকে লেহাজ।
আবারো বুড়ির গলা জড়িয়ে সুর ধরলো লেহাজ।
‘রঙ্গলীলা বহুত চালিয়েছো ঢঙ্গিলা সখী। তোমার সাতকাহন শুরু করো তো এবার। যে দাবড়ানিটা খাইয়েছো আজ, তাতে করে ন্যাতা ন্যাতা মেরে গ্যাছে সব্বো শরীর আমার। ঘুমে জড়িয়ে আসছে ক্লান্ত চোখের পাতা। বেশিক্ষণ তোমার ভ্যাদ ভ্যাদানি শোনার মতো মুড নাই আপাতত। ন্যাও, গীত ধরো এবার।

‘তাহলে আগে নিজের কাহিনি দিয়েই শুরু করি কী বলিস?’
বুড়ির কোলের মধ্যে মাথা গুঁজে আয়েশ করে ঠ্যাং ছড়িয়ে শুয়ে কোলের ওপর সজোরে নাক ঘসে সায় দিলো লেহাজ।

‘শোন তাহলে। মাত্র দশ বছর বয়সে তোর দাদার সাথে বিয়ে হয় আমার। ঘর সংসার, স্বামী কি জিনিস- কিভাবে তাকে আদর সোহাগে আগলে রাখতে হয়- কিছুই বুঝতাম না বা বোঝার মতো পরিণত বয়সও নয় ওটা। তোর দাদার তখন সতেরো। টগবগে তাগড়া জোয়ান যাকে বলে। রূপ যৌবন সব ধ্বসে পড়লেও এখনো যেটুকু অবশিষ্ট দেখছিস, তাতে নিশ্চয় অনুমান করতে পারবি সেই সময় তাহলে কেমন থাকার কথা ছিলো আমার! মাশাআল্লাহ -! রূপ ফেটে পড়তো টকটকে লাল পাকা বেদানার মতো। লোভী চোখে আমাকে গিলতে গিলতে সময় নাই অসময় নাই, রাক্ষসের মতো যখন তখন নির্লজ্জ তোর দাদা এসে ঝাঁপিয়ে পড়তো আমার ওই বয়সেই। প্রথম দিকে কষ্টে ঘেন্নায় লোকটার দিকে তাকাতেও অরুচিতে বমি পেতো আমার। এতেও যদি খিদে মিটতো তোর দাদার, তাও নাহয় সহ্য করে নিতাম কোনরকমে। ছেলের লুচ্চামির চোটে বাইরের মানুষের সামনে লজ্জায় মুখ দেখাতে পারতেন না আমার শ্বশুর। কাজের মহিলা রাখার উপায় ছিলো না এ বাড়িতে। দশ সন্তানের মা-ই বা কি আর ঘুটঘুটে ঘসঘসে চার মনি কালো বস্তা তাতেই বা কী -শুধু চিনিয়ে দেয়ার দরকার -বিপরীত লিঙ্গের কোন জীব সেটা। কোন কিছুতেই রুচির অভাব দেখতাম না লোকটার। নিরুপায় হয়ে বাড়িতে কাজের মানুষ রাখাই শেষ পর্যন্ত বন্ধ করে দিলেন আমার শ্বাশুড়ি। এভাবেই বয়স বাড়তে বাড়তে একসময় জন্ম দিলাম একে একে তোর বাবা, চাচা আর তোর তিন ফুপুকে। আমার সবচে’ বড় ব্যর্থতা কী জানিস? একটা ছেলেমেয়েও পেলো না আমার স্বভাব চরিত্রের ছিটেফোঁটাও। পেলো সবাই বাপের ছোঁকছোঁকানি আর নির্লজ্জ বেহায়াপনাগিরি। বাধ্য হয়েই তাই কঠোর হাতে হাল ধরতে হলো আমাকে। এরকম কঠিন কঠোর না হলে মানুষ করতে পারতাম না একটাকেও।
পড়ালেখার প্রতি আমার আগ্রহ জন্মেছিলো সেই অক্ষর জ্ঞান থেকেই। কিন্তু পড়ার আর সময় পেলাম কোথায়? শুরু করতে না করতেই তো শেষ হয়ে গ্যালো সাথে সাথে! তোদের বংশ, প্রাচূর্য্য, তোর দাদার ওরকম বাঘে ধরা রূপ -আবার আমাকে নিয়ে যাবার জন্য তাদের পীড়াপীড়ি -সব দিক দেখেশুনে বাপ মা ধরে পরের ঘরে পার করে দিলো ওই অতটুকুন মেয়েকে। ভেতরের তৃষ্ণাটা কিন্তু সাথেই ছিলো। সংসার ছেলেপুলে সামলে সময় পেতাম যেটুকু,বিভিন্ন জায়গা থেকে বই সংগ্রহ করে মাতাল হয়ে পড়ে থাকতাম সেগুলো নিয়ে। ইতিহাসের প্রতি বরাবরই আমার আগ্রহটা ছিলো সবচে’ বেশি। তাই ইতিহাস বিষয়ক কোন বই হাতের নাগালে পেলেই শেষ করে ফেলতাম এক নিঃশ্বাসে।

সারা বিশ্ব আগ্রাসী মোঘল সাম্রাজ্য কেনো ধ্বংস হয়ে গ্যালো অত তাড়াতাড়ি – বিষয়টা প্রায়ই অনুসন্ধিৎসু করে তুলতো আমাকে। সম্রাটেরা সব মুসলমান, কত উচ্চ মানের স্থাপত্যের নিদর্শন রেখে গেছেন তাঁরা পৃথিবী জোড়া মসজিদ, মিনার স্থাপন করে। মুসলিম ঐতিহ্যের ধারক বাহক একেকজন সম্রাট। নিজেরাও যে ধর্মকর্ম পালন করতেন না, তাও না -তাহলে কেনো একেকজন সম্রাটের এই করুণ পরিণতি? কিন্তু প্রকৃত মুসলিম ঐতিহ্য তো গৌরবোজ্জ্বল বিজয়ের মহান সাক্ষর হয়ে সমুজ্জ্বল বিজয়ের গৌরবগাথায় মাথা উঁচু করে আজো বেঁচে আছে ঠিক তেমনি!

জানিস কিনা জানি না, একটা যুগই ছিলো শুধু মুসলিম বিজয়ের স্বর্ন যুগের মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রথম গণিতজ্ঞ, রসায়নবিদ সহ উদ্ভাবনী কাজের সাথে জড়িত বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই ছিলেন মুসলিম! তাহলে এদের এই মর্মান্তিক ধ্বংসের পেছনে রহস্যটা কী?

খুঁজতে খুঁজতে একসময় নিজের মতো করে একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করালাম মনের ভেতর। লক্ষ্য করে দেখেছি,এদের মধ্যে দু’ একজন ছাড়া প্রত্যেকেই ছিলো দুঃশ্চরিত্র আর লাম্পট্যের শিরোমণি। শ’য়ে শ’য়ে বিবি, বেগম, সম্রাজ্ঞী দিয়েও পেটের অসীম ক্ষুধার জ্বালা পুরণ হয়নি এদের কারোই। নিজেদের জন্য বিলাসবহুল হেরেম তৈরি করে নিয়েছিল এরা বেহেশতী হুরীদের দুনিয়ার ওপরে বসেই ভোগ করার জন্য। দাসী বাঁদী বাছবিচার নাই। যেখানে যে রূপবতী নারী দেখেছে -হোক সে অন্যের পত্নী, প্রেমিকা,হিন্দু জৈন,ক্ষত্রীয়-যেনো তেনো প্রকারেণো সঙ্গে সঙ্গে এনে ভরেছে তাদেরকে নিজেদের হেরেমে। পড়তে গিয়ে সেই সব হেরেমবাসী নারীদের বুক ভরা হাহাকার আর শূণ্যতার ভারি দীর্ঘশ্বাসে দমবন্ধ হয়ে আসতো বুকের ভেতরটায়। আবার সেই হেরেমবাসী রমনীদের পাহারা দেয়ার জন্য কী করতো এরা জানিস?পাহারাদার হিসাবে রাখতো সব খোজা প্রহরী। শক্ত সমর্থ পুরুষদের ধরে ধরে এনে লিঙ্গ ব্যবচ্ছেদ করে বসানো হতো তাদের হেরেমের দরজায়। ভাবতে পারিস কোন পর্যায়ের বর্বর হলে সম্ভব এটা?

প্রেমের দেবতা সম্রাট শাজাহানের নামে ধন্য ধন্য রব তুলিস না তোরা? তাজমহলের নেপথ্যের ভালোবাসার গল্প গানে কবিতায় মো মো করে শিল্প সংস্কৃতির বাগ বাগিচা। ভালোবাসা আর প্রেমের বিবিকে পৃথিবীতে অমর করে রাখতে শাজাহান নির্মাণ করেছিলেন বেহেশতী আদলের কবরখানা। আজকাল অবশ্য চোখ কান ফুটেছে অনেকেরই। তাজমহল নির্মাণের পেছনে মমতাজের প্রতি ভালোবাসার কারচুপিটা ধরা পড়ে যাচ্ছে আজকাল অনেকের চোখেই। তবে এর স্থাপত্যশৈলীর কাছে আজো বিশ্বের যে কোন তাবড় তাবড় আর্কিটেক্ট আর ইঞ্জিনিয়ার যাই বলিস, তারাও কিন্তু এসে ঘোল খেয়ে যায় রীতিমতো।

যেহেতু শাজাহান ছিলেন একজন সুবিজ্ঞ মুসলিম সম্রাট, তাই পবিত্র মহাগ্রন্থ সম্পর্কেও ছিলো তার অগাধ জানাশোনা। বেহেশতের যে নকশার বর্ণনা দেয়া আছে পাক কালামে, ঠিক সেই নকশা অনুযায়ী নির্মাণ করা হয় তাজমহল। বেহেশতের প্রবেশদ্বারে লেখা থাকবে -‘নির্ভয়ে এখানে প্রবেশ করো।’ তাজমহলের প্রবেশদ্বারেও ক্ষোদিত আছে হুবহু ওই বাণীটায়।
বুঝতে পারছিস খোদার ওপর কতবড় খোদকারী করেছে জঘন্যরকমের সীমালঙ্ঘনকারী পাপী ইবলিশের বংশ মুসলিম ইতিহাসের কলংক, শাজাহান নামের এই লম্পট সম্রাট?
চূড়ান্ত রকমের ভোগবাদী এসব সম্রাটেরা বিলাস ব্যাসনের জৌলুশে গা ভাসাতে গিয়ে ভুলেই গিয়েছিল, চিরস্থায়ী বেহেশতী সুখ ভোগ করতে কেউই আসেনি এই পৃথিবীতে!
এবার মেলাতে পারিস কিনা দ্যাখ তো? এদের ওপর গজব ভেঙে পড়বে না তো কাদের ওপরে গজব ভেঙে পড়বে বল তুই?

শাজাহানের শেষ পরিণতি সম্পর্কে জানিস কিছু? নিজের ছেলের হাতে নির্মম কারাবন্দী অবস্থায় করুণ মৃত্যু ঘটে নিষ্ঠুর এই সীমালঙ্ঘনকারী সম্রাটের। সেবা যত্নের জন্য কারাগারে একজন প্রহরী পর্যন্ত দেয়া হয়নি তাকে। মুঘোল অন্তঃপুরের মধ্যমণি মাতৃহীনা জাহানারা পিতার এই নিদারুণ দুঃখ কষ্টকে মমতা, সেবা, প্রীতি দিয়ে বেষ্টন করে রেখেছিলেন শাজাহানের এই চরম দূর্দিনে ছায়া সঙ্গী হয়ে স্বেচ্ছা কারাবাস বরণের মাধ্যমে। শাজাহানের দুই কন্যার মধ্যে জাহানারাই ছিলেন সবচেয়ে বুদ্ধিমতি, বিদূষী, কর্মকুশলা -যার উপাধি ছিলো -‘ বাদশাহ বেগম!’ সাম্রাজ্য পরিচালনাতেও পিতার সহযোগী ছিলেন তাঁর এই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমতী কন্যা জাহানারা।

হিন্দু মুসলিম মিলনের প্রেরণায় অনুপ্রাণিত জাহানারার আকর্ষণ ছিলো বুন্দেলা রাজা ছত্রশালের প্রতি। মহাবীর, সাহসী আত্মবিশ্বাসী আর অনুভূতিপ্রবণ এই হিন্দু রাজাকেই বেছে নিয়েছিলেন তিনি প্রেমিক হিসেবে। জাহানারার অনেক মধুময় রোমাঞ্চ কাহিনি গড়ে উঠেছিলো রাজা ছত্রশালকে কেন্দ্র করে। যদিও ভাই দারাও চেয়েছিলেন এবং বীর যোদ্ধা নহবত খান নিজেও ছিলেন তাঁর পাণিপ্রার্থী-তারপরেও প্রেমিক হিসেবে ছত্রশালই প্রাধান্য পেয়েছিলেন তাঁর কাছে। দিল্লি আগ্রার দরবারে অনেকেই জানতো ছত্রশাল-জাহানারার প্রেম কাহিনি। আর এই প্রেমের পেছনে কারণ হিসাবেও ছিলো হিন্দু ধর্ম ও হিন্দুশাস্ত্রের প্রতি জাহানারার গভীর মমত্ববোধ। শুধু তাঁর এই কোমল হৃদয়ের জ্বাজ্জল্যমান ভালোবাসার কারণেই ভালোবাসার মূর্ত প্রতিক উদার বিজয়ী শ্বাশত বিদূষী নারী হিসেবে জাহানারার নাম সোনার হরফে লেখা থাকবে চিরকাল পৃথিবীর বুকে।

এইবার শোন, নিজের মেয়ের প্রতি শাজাহানের নির্মম নিষ্ঠুরতার কাহিনিটা। তখন শাহাজাদীদের বিবাহ হবে না -এটাই ছিলো মোঘল সাম্রাজ্যের বিধান। তারপরেও বিভুষিতা মোঘল নারী জাহানারা এই বিধানের বাইরে গিয়ে আকৃষ্ট হয়েছিলেন ছত্রশালের প্রতি। এই বিধি ভঙ্গের দায়ে ইতিহাসেও বিরল যে নৃশংসতার দৃষ্টান্ত, তারচেয়েও ভয়ংকর নিষ্ঠুর প্রক্রিয়ায় হত্যা করা হয় ছত্রশালকে। সাংঘাতিক রকমের মধ্যযুগীয় বর্বরতার শ্রেষ্ঠ নির্দশন রূপে এই হত্যাযজ্ঞ কালের সাক্ষী হয়ে থেকে যাবে ঘৃন্যতার ইতিহাসের পাতায়। শুধু তাই না। হত্যার এই নির্মম বর্ববরতা যেনো স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে পারেন জাহানারা, সেজন্য প্রেমিকের হত্যার পুরো প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন করা হয় জাহানারার চোখের সামনে। জোরপূর্বক জাহানারাকে ধরে এনে তাঁকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করেছিলেন পিতা শাজাহান!
ফার্সী বিদুষী কবি জাহানারা চিরকালের মতো স্বেচ্ছায় মেনে নিলেন চিরকুমারিত্ব। হৃদয় কতটা ঐশ্বর্যশালী উদারতায় সমৃদ্ধ হতে পারে তারও অপ্রতিদ্বন্দী সাক্ষরবহণকারী রমনীর নামটাও কিন্তু জাহানারা। যে পিতা সারাজন্মের জন্য কান্নার সৌভাগ্য এঁকে দিলেন আত্মজার ললাটে, পিতার সেই ভোগ বিলাস ব্যাসন, প্রহরী, প্রাচূর্য, হেরেম সহ সব খোয়ানো দীনহীন ভিক্ষুকের চাইতেও করুণ অসুস্থ পঙ্গু অবস্থাতে তার আর সব সন্তানেরা মুখ ফিরিয়ে নিলেও কন্যা জাহানারা কিন্তু তাঁর মানবিকতাবোধের দায় এড়াতে পারেননি সেখানেও। পিতার জন্য কারাকক্ষে বন্দীত্ব বরণকারী জাহানারা পিতার মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর সেবা শ্রশ্রুষায় নিষ্ঠা থেকে বিচ্যুত হননি এক পলকের জন্যও। কতবড় আত্মত্যাগী মোহমুক্ত উদারচেতা নারী হলে এটা সম্ভব -ভাবতে পারিস?

শাজাহানের মৃত্যুর পর চৌদ্দ বছর আগ্রা দূর্গে বন্দিনী জীবন যাপন করেছেন জাহানারা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে জীবনের অসারতা উপলব্ধি করেছিলেন তিনি মর্মে মর্মে। আর এই উপলব্ধি থেকেই এই শেষ সময়টা কাটিয়েছেন তিনি আত্মকাহিনী রচনা করে। এই আত্মজীবনীরও কিছু অংশ তিনি ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন যমুনার জলে। পরবর্তীতে অবশ্য মত পরিবর্তন করে জিনমিন প্রাসাদের শিলাতলে সেগুলো গচ্ছিত রেখেছিলেন এই ভেবে, হয়তো তাঁর ব্যথার মর্মকাহিনি পড়ে একদিন তাঁর জন্য দু’ফোটা চোখের পানি ফেলবেন কোন পাঠক! অনুকরণীয় বিদুষী কবি এই রমনী -শ্রেষ্ঠ নিজের এপিটাফটাও লিখে রেখে গিয়েছিলেন নিজের হাতে। কোনদিন যদি দেখার সুযোগ হয় তাহলে জাহানারার সমাধিটা দেখে আসিস একবার। সমাধি ফলকে জ্বলজ্বল জ্বলছে কোমল নারীর স্নিগ্ধ শীতল শান্ত হৃদয়ের নীরব কান্নার সুর-

‘গরীব গোরে ফুল দিও না দীপ জ্বেলো না কেউ ভুলে
শামা পোকার না পোড়ে পাখ দাগা না পায় বুলবুলে!
নিঃস্ব আমি নিরাভরণ ধূলির ধূসর অংকেতে
শুয়ে আছি গুহার তলায় ডুবছি কালের সংকেতে! ‘

এই অবধি এসে হঠাৎই স্তব্ধ নিরবতায় ভারী হয়ে পড়লো ঘরের আবহাওয়া। সম্ভবত কান্না সামলাচ্ছিলেন লেহাজের সুচিত্রা সেন।
কিছুটা সময় পার করে কান্না আবেগে রুদ্ধ কন্ঠটা পরিষ্কার করে নিয়ে আবারো কথা শুরু করলেন সুচিত্রা দেবী।

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলার করুণ পরিণতি নিয়ে কতই না হায় হায় আহাজারিতে কান্নাকাটি করে মরে যাই আমরা-তাই না? মনে হয়, আহা! সরল সহজ আলাভোলা বিশ্বাসী যুবক নবাবের সাথে এতটা বিশ্বাসঘাতকতা করলো সবাই মিলে?

নিজের করুণ পরিণতিটা মানুষ নিজেই কিন্তু সবসময় নিজের হাতে যত্নের সাথে আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসে নিজের জীবনের জন্য। মানুষের করুণ পরিণতির জন্য আর কেউ না – সে নিজেই দায়ী -এটা মনে রাখবি সবসময়। এখন শুধু একটা গল্প শোনাবো তোকে সিরাজুদ্দৌলা সম্পর্কে।

সিরাজুদ্দৌলার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেনাপতি মোহনলালের বোন হীরার সাথে গোপন প্রণয় ছিলো সিরাজের। বিশ্বস্ত প্রেমিকা তার জীবন যৌবন নির্ভয়ে সঁপে দিয়েছিলেন সিরাজের খামখেয়ালীপনার চরণ তলে। জের স্বরূপ একসময় গর্ভবতী হলেন হীরা। পেটের সন্তান -হোক সে অবৈধ -কোন মা’ই চান না সেই সন্তানকে নিজ হাতে ধ্বংস করতে। হীরাও পারেননি। সন্তান জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে নিজের পাপ চাপা দেয়ার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ঘোড়ার পেছনে সেই সদ্যজাত নবজাতককে বেঁধে ঘোড়াকে আরো দ্রুতগামী করতে ঘোড়ার গায়ে তীরবিদ্ধ করেন সিরাজুদ্দৌলা। যাতে করে মৃত্যু যন্ত্রণায় উদ্ভ্রান্ত ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে অক্কা পায় সিরাজের পাপের ফসল হীরার গর্ভের ধন! হীরা মেনে নিতে পারেননি আত্মজের এই ভয়ংকর মৃত্যু প্রণালী। উন্মাদিনী হীরা সন্তান বুকে ফিরে পেতে ছুটে গেছেন ভাই মোহনলালের কাছে। সব শুনে সিরাজের ঘোড়ার চেয়েও ক্ষীপ্র গতিতে মোহনলাল পৌঁছে যান তীরবিদ্ধ সেই ঘোড়ার কাছে। রাখে আল্লাহ মারে কে! ঘোড়ার পিঠ থেকে সেই সদ্যজাত শিশুকে উদ্ধার করে সিরাজের নৃশংসতার হাত থেকে বাঁচাতে গোপনে নিজের কাছে রেখে সেই সন্তানকে বড় করেছিলেন হৃদয়বান মাতুল মোহনলাল।

হীরার সন্তানের সুরক্ষার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করে সিরাজের মাতামহ আলীবর্দি খানের কাছে দৌহিত্রের এই অনৈতিকতার বিচার চাইতে গেলেন মোহনলাল। কৌশলী দূরদর্শী আলীবর্দি খান কিন্তু ঠিকই জানতেন,উড়নচণ্ডী সিরাজের মসনদ অটুট রাখতে মোহনলালের মতো সুদক্ষ সেনাপতির বিকল্প নেই। মোহনলালকে ধরে রাখতে হবে তাই যেভাবেই হোক না কেন! অনেক ভাবনা চিন্তা শেষে অবশেষে সমাধানে পৌঁছালেন উভয় দল। ধর্মান্তরীত করে হীরাকে মুসলিম বানিয়ে বিয়ে দেয়া হলো সিরাজুদ্দৌলার সাথে।

ইতিহাসে যাকে আলেয়া নামে চিনি আমরা -তিনিই হলেন সেই মোহনলালের বোন, সিরাজের গোপন প্রেমিকা, বৈচিত্রময় নবাবী ইতিহাসের এক বৃহৎ অংশ জুড়ে থাকা অনেক কাহিনীর জন্মদাত্রী, যৌবনের বন্ধনমুক্ত ভেলায় ভেসে আসা সিরাজের অবৈধ সন্তানের কুমারী মাতা হীরা!

কোন পূর্ব সংকেত না দিয়েই লেহাজের ঘোরের আবেশে আচ্ছন্ন কানে ক্ষীণ ভেসে এলো যেনো দূরাগত কোন মিষ্টি সুরেলা পাখির কন্ঠ ধ্বনি –
‘আজকের মতো এটুকুই থাক না হয়– ‘

বুলবুল সুরটা বুঝে উঠতে খানিকক্ষণ সময় লাগলো লেহাজের। কানের ভেতর এতক্ষণ ধরে বয়ে চলা বিচিত্র ইতিহাসের স্রোতের ধারা বেয়ে লেহাজও যেনো পৌঁছে গিয়েছিলো কখনো তাজমহলে, কখনো হেরেমের শাহী দরজায় অসহায় খোজা প্রহরীর পাশে, কখনো বা মোঘল সাম্রাজ্যের অধিশ্বরের বর্বরতার সামনে, কখনো নির্জনে বিষাদিত স্বেচ্ছা রচিত কারাকক্ষে বিদূষি কবি জাহানারার নিঃসঙ্গ একলা শয়ন কক্ষে- কখনো আবার নিজেকে দেখতে পাচ্ছিলো ও জাহানারার সমাধির এপিটাফের দিকে পলকহীন গভীর দৃষ্টিতে নিজের ধ্যানমগ্নতা। কখনো সিরাজুদ্দৌলার তীরের আঘাতে নবজাতক বহনকারী রক্ত রুধির ঘোড়ার পেছন পেছন নিজেকে মোহনলালের ভূমিকায় —

ইতিহাসের সাদা কালো লালে সমৃদ্ধ বুক ভেদ করে কোত্থেকে যেনো আবারো ভেসে এলো বুলবুল ধ্বনির সুমিষ্ট সুরেলা খেয়াল-

‘রাত অনেক হয়েছে। ঘুমা এখন। সময় পেলে কাল শোনাবো বাকিটা- ‘

হঠাৎই চমক ধমক দিয়ে কে যেনো গভীর ঘুমের ঘোর ভাঙিয়ে জাগিয়ে দিলো লেহাজকে! এতক্ষণের বয়ে চলা ইতিহাসের কাল স্রোতের সাথে ওর লেহাজ নামের মিলনের মাঝে যোগসূত্রকারী মোহনাটা কোথায়?

প্রশ্নটা করার জন্য চোখ খুলতেই দেখতে পেলো ও, ছিপছিপে গড়নের অদ্ভূত সুন্দর ব্যক্তিত্বের ছন্দে দোলায়িতো এক জোড়া স্নিগ্ধ শীতল পা ধীরে ধীরে ওর দরজা ডিঙিয়ে পার হয়ে চোখের আড়ালে মিলিয়ে যাচ্ছে যেনো অশরীরী রূপবতী কোন পরীর মতোই!

আজন্ম পরিচিত ছড়িধারী বুড়িকে এই মুহূর্তে ওই রূপে ভীষণ অপরিচিত মনে হলো লেহাজের কাছে!

সম্পূর্ণ অপরিচিত এই ভদ্র মহিলাটা আসলে কে?
মমতাজ মহল?
জাহানারা?
নাকি আলেয়া?

নাহ্! হীরা! ঝকঝকে গৌরবর্ণা ঐশ্বর্যময়ী রত্নখনির সাথে স্বচ্ছন্দে মিলিয়ে দেয়া যায় রূপকথার অপরূপা এই পরীটাকে!

#নাহ্! আজিকেও হইলো না শেষ!
আর কতদূরে নিয়ে যাবে মোরে হে ঘৎবানু স্নিগ্ধ বতী?

# জাহানারার এপিটাফের কবিতাটা পুনরুদ্ধার করে দেয়ার জন্য অশেষ কৃতজ্ঞতা আমার তত্বজ্ঞাণী জননীর চরণে! সত্যিই অসীম সৌভাগ্যবতী কন্যা আমি- যার আছে আমার মায়ের মতো এরকম ধনবতী জননী! আলহামদুলিল্।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 20121 deshsangbad24.com

প্রযুক্তি সহায়তায় : একাতন্ময় হোস্ট বিডি