যা ঘটেছিল শেরপুরে
স্থানীয় সহকর্মী সাংবাদিকদের তথ্য, প্রত্যক্ষ্যদর্শীর বর্ণনা এবং ভিডিও অনুযায়ী, শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে হামলা-পাল্টা হামলার মধ্যে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিমকে মাথায় এবং কানের নীচে কুপিয়ে হ/ত্যা করেছে বিএনপির প্রার্থীর সমর্থকরা।
কী কারণে এই নৃশংস হ/ত্যা তা জানলে, অবাক হবেন। ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানের সামনের সারির চেয়ারে বসা নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। ঝিনাইগাতী স্টেডিয়ামে সব প্রার্থীর ইশেতহার প্রকাশ অনুষ্ঠান ছিল সহকারী রিটার্নিং তথা ইউএনওর আয়োজনে। ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলা মিলে শেরপুর-৩ আসন।
বেলা আড়াইটার অনুষ্ঠানে জামায়াত প্রার্থীর সমথর্করা আগে দিয়ে সামনে চেয়ারে বসেন। বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হাসান রুবেল পার্শ্ববর্তী উপজেলা শ্রীবরদী নির্বাচনের প্রচারে থাকায় তাঁর আসতে বিলম্ব হয়। তাই তাঁর সমর্থক কর্মীরাও বিলম্বে আসেন। ততক্ষণে অনুষ্ঠানস্থলের সামনে ৫০০ আসনের অধিকাংশ জামায়াত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের কর্মী সমর্থকরা বসে পড়েন।
তখন বিএনপি নেতারা ইউএনওকে বলেন, অর্ধেক অর্ধেক আসন ভাগ করে দিতে। ইউএনও জামায়াত প্রার্থীকে বলেন, কিছু চেয়ার ছেড়ে দিতে। জামায়াত প্রার্থী মাইকে কর্মীদের আসন ছাড়তে বলেন। তবে সমর্থকরা সামনের সারির অর্ধেক আসন ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়ে পেছনের কিছু চেয়ার খালি করে দেয়।
এ নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হলেও দুই পক্ষ স্লোগান দেয়। জামায়াতের সমর্থকদের চেয়ার থেকে তুলতে গেলে, হাতাহাতি শুরু হয়। এ সময়ে চেয়ার ছুঁড়াছুঁড়ি শুরু হয়। হাতাহাতি হয়। কে কম মেরেছে, কে বেশি মেরেছে- এই আলাপে যাচ্ছি না। তবে পুলিশ কিছু না করে চুপ মারামারি চেয়ে চেয়ে দেখে।
বিএনপির নেতাকর্মীরা স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে দক্ষিণে ঝিনাইগাতী বাজারে অবস্থান নেয়। মাঠে থাকে জামায়াতের প্রার্থী ও সমর্থকরা। এর কিছু সময় পর খবর আসে ‘ফাহমী গোলন্দাজ সোহেল’ কোন এক ব্যক্তি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে, ‘জামায়াত প্রার্থী বাদলকে পেলে জ/বা/ই করা হবে’।
এটা নিয়ে শুরু হয় নতুন উত্তেজনা। জামায়াত প্রার্থীদের সঙ্গে শ্রীবরদী উপজেলার নেতাকর্মীরাও ছিলেন। তাদেরকে নিজ এলাকায় ফিরতে হলে, বাজার হয়ে যেতো হতো। কিংবা গ্রাম ঘুরে যেতে হবে। জামায়াত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল ঘুরো পথে যেতে অস্বীকৃতি জানান। ইউএনও এবং বিএনপির নেতারা তাঁকে উত্তর দিক যেতে অনুরোধ করলেও তিনি রাজি হননি।
এর কারণ রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি। বাজার এড়িয়ে গেলে, ভোটের মাঠে প্রচার হতো ভয়ে বাদল পিছু হটেছে। জামায়াত প্রার্থী জীবন গেলেও বাজারের রাস্তা দিয়েই যাওয়ার জেদে অনড় থাকেন। এভাবে বেলা সাড়ে তিনটা থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত, দুই ঘণ্টা সময় যায়।
বাজারে অবস্থান নেওয়া বিএনপি নেতাকর্মীরাও জেদ ধরে তারা বাদলকে এই রাস্তা দিয়ে যেতে দেবে না। বাদলকে ঘুরে যেতে হবে। কিংবা শ্রীবরদীর লোকজনকে মা/রা হবে। ইউএনও এবং পুলিশ বিএনপির কর্মীদের রাস্তা ছেড়ে দিতে রাজি করাতে পারেনি।
সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে ঝিনাইগাতী স্টেডিয়াম এলাকায় থাকা জামায়াতের হাজারখানেক নেতাকর্মী মিছিল নিয়ে বাজারে প্রবেশ করে। এই সময়ে দুই পক্ষের ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়। ভিডিও এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, জামায়াতের হামলায় এই সময়ে পিছু হটে বিএনপির নেতাকর্মীরা। ইটের আঘাতে বিএনপির জমায়েতে থাকা এক ব্যক্তিকে এ সময় রাস্তায় পরে থাকতে দেখা যায়। জামায়াতের কর্মীদের হামলা তিনি আহত হন। এ সময় পিছু হটলেও, বিএনপির নেতাকর্মীরা রাস্তা ছাড়েনি। সেনাবাহিনী ও পুলিশ দুই পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নেয়।
মিনিট ১৫ পর বিএনপির নেতাকর্মীরা পাল্টা ধাওয়া এবং হামলা করে। ধাওয়ায় জামায়াত নেতাকর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে উত্তর-পশ্চিম দিকে রাস্তায় চলে যায়। পেছনে পরে যান জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিম। তাঁকে তখন একা পেয়ে কোপায় বিএনপির কর্মীরা।
এই হলো বিস্তারিত ঘটনা। সেনাবাহিনীর একজন সদস্য আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে ঘটনার বিস্তারিত জানতে পারিনি।
চেয়ারে বসা আর একটি রাস্তা দিয়ে যেতে না দেওয়া এবং যেতে চাওয়ার জেদের কারণে একজন মানুষের জীবন চলে গেলো। জীবন কত মূল্যহীন হয় এই দেশে!
পুরো ঘটনা প্রবাহে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের সিরিয়াস ঘাটতি ছিল। প্রথম মারামারির সময় যদি পুলিশ সব পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে দিলে, আর কিছুই ঘটত না। তা না করায় বিএনপি এবং জামায়াত পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতেইদুই ঘণ্টা ধরে স্টেডিয়াম এবং বাজারে অবস্থান নিয়েছিল। দুই পক্ষই এই সময়ে তাদের জমায়েত বড় করে এবং শক্তি বৃদ্ধি করে। আশেপাশে এলাকা থেকে তাদের সমর্থকরা এসে যোগ দেওয়ার সময় পায়।
পুলিশ যদি বাজারের রাস্তা অবরোধ করা বিএনপির কর্মীদের সরে যেতে বাধ্য করত কিংবা জামায়াতের প্রার্থীকে ঘুরে যেতে বাধ্য করত- তাহলেও প্রাণহানীর মত কিছু ঘটত না।
দ্বিতীয় দফার সংঘর্ষের সময়ও যদি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী অ্যাকশনে যেতো তাহলেও হয়ত প্রাণহানী এড়ানো যেতো।
আজকের ঘটনার পর প্রশ্ন, যদি তুচ্ছ ঘটনা, ফেসবুকে ‘জ/বা/ই’ পোস্ট থেকে এই রকম সংঘর্ষ হয় তাহলে, এই নির্বাচন কমিশন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন একদিনে ৪৫ হাজার কেন্দ্রে ভোট কীভাবে করবে? সেদিন তো শত শত উত্তেজনাকর ঘটনা ঘটবে। ড. ইউনূস আপনার কী কোনো পরিকল্পনা আছে?
কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় ওপরের ঘটনাক্রম এভাবে পেয়েছি। এটা যদি আপনার দলীয় চিন্তার সঙ্গে না মেলে, তাহলে যথারীতি গালি দিয়ে যায়েন।
@Rajib ahamod ভাইয়ের টাইমলাইন থেকে